প্রলাপ

We belong to such a sphere where we ourselves are alienated. আমরা এমন এক রাজ্যে বিরাজ করছি, যেখানে আমরা নিজেরাই নিজেদের জগতে পরবাসী। আমার রাজ্যে আমি নিজেই নিজের কাছে অচেনা। আমি আর তুমিতে কোন মিল নেই। সেখানে ‘আমরা’ তো অনেক দূরের কথা। আমি আর তুমি এক সাথে থাকছি ঠিকই, কিন্তু আদৌ কী আমাদের মাঝে কোন মিল আছ? We all have built our own island. যতক্ষণ তুমি আমার চাহিদায় ব্যঘাত না করছ, আমি তোমার সবচেয়ে কাছের ‘বন্ধু।’ আমি বলছিনা, ‘তুমি খারাপ, আমি ভালো।’ আমরা দুজনই ভালো, কিন্তু আমাদের দুজনের একসাথে ভালো থাকা সম্ভব নয়। আমদের ভালোগুলো কেন জানিনা পরস্পর বিরোধী। অথচ তোমার আমার মাঝে কী সত্যি ই কী কোন বিরোধ আছে? আমরা তো জন্মগতভাবে কখনোই বিরোধী ছিলাম না। তাহলে বলত, এই ‘আমি-তুমি’র জন্ম কিভাবে হল? আমাদের দুজনের মাঝে বাণিজ্য যেদিন থেকে বাস করতে শুরু করল। আমাদের ভালো লাগাগুলো যেদিন থেকে চাহিদা-যোগান বিধি মেনে চলতে শুরু করল, সেদিন হঠাৎ ই আমাদের বিকেলের চায়ের কাপেও তা ভর করতে শুরু করল। যা আমার জন্য ভালো ও শুভকর তা তোমার জন্যও। তাহলে বাজারের সবচেয়ে ‘ভালোটা’ আমার ব্যাগে কেন, বলতে পারো? কারণ আমার হিপ উঁচু করা মানিব্যাগ সগৌরবে তার মহত্ব জাহির করছে। আর তার ভেতরে ভাঁজ হয়ে থাকা নোটগুলো আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, তোমার মাথাটাও আমি ইচ্ছে করলেই কিনে ফেলতে পারি, আস্ত পুরে ফেলতে পারি আমার বাজারের থলেতে। মার্ক্স সাহেবের Have আর Have not থিয়োরিকে অস্বীকার করার সাহস আমার নেই। তোমার কী মনে হয়না, এই তত্ত্বটা আমাদের সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক সকল প্রতিষ্ঠানেই প্রযোজ্য। একদল মানুষ ধর্মের মত অতি সংবেদনশীল বিষয়কে পুঁজি করে বেঁচে আছে। আমাদের চোখের সামনে নগ্ন হচ্ছে আমার বোন, তোমার প্রিয়তমা, কারোও আদরের ছোট্ট খুকিটা। আমি হয়ত পাশেই দাঁড়িয়ে ভুভুজিলা বাজাচ্ছি। রাজনীতিকরা এটিকে বলছেন ‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। সমাজের সুশীল জনগণ উঁটপাখিকে জাতীয় পাখি করা যায় কিনা সেই চিন্তায় বিভোর। সেই সাথে এই রঙ্গে যোগ দিয়েছেন আমদের হলুদ মিডিয়া। নগ্ন হয়ে নুয়ে পড়া তরুণীকে কে কত বেশি ফোকাসে আনবেন, তাই বিবেচ্য। রগরগে বর্ণণায় প্রচার সংখ্যা বাড়াতেই হবে! টিভি চ্যানেলগুলোর টি আর পি অন্যদের চেয়ে বেশি থাকাটাই মূখ্য। আদরের খুকিটা কিন্তু নগ্ন অচেতন হয়েই পড়ে আছে।
আমাদের মধ্যেই একদল নগ্ন হচ্ছি, আরেকদল নগ্ন করছি। তুমি কী জানো, এরা দুদলই কোন না কোন স্কুল-কলেজ থেকে জিপিএ ৫.০০ পাওয়া। কী, অবাক লাগছে! এটাই আমাদের শিক্ষার প্রকৃত রূপ। “আবাদ করলে ফলত সোনা”। কিন্তু আবাদটা করবে কে? ধর্ম চলে গেছে ‘তেঁতুল তত্ত্বে’। সমাজ আমাদের নির্ধারণ করে দিচ্ছে, ধর্মের শিক্ষা শুধু মাত্র দিতে পারে টুপি-দাঁড়িধারী কিছু পেশাদার তথা কথিত আলেম জাতি। যেখানে শেখানো হচ্ছে, কলমের চেয়ে তরবারির জোর বেশি। ক্ষুদে মওলানারা হুরের চিন্তায় দিনরাত এক করে দিচ্ছে। জিহাদ মানেই সহিংসতা। জিহাদ মানেই আরোও একটি মায়ের কোল খালি হওয়া! ধর্মের আদিসত্য সুন্দর রূপ তো কবেই ধুয়ে মুছে গেছে। যেটুকু অস্থি-মজ্জা এখনো রয়ে গেছে তা নিয়ে চলছে কুকুরের হাঁড় টানাটানি খেলা। আল্লাহ বেশি ক্ষমতাধর না ভগবান? না বুদ্ধ? না যিশু? নেপালে ভূমিকম্পে যেখানে লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত, শত শত বুদ্ধ মন্দির মাটির সাথে মিশে গেছে, সেখানে এত ধকল সহ্য করেও কোন বিশেষ কারামতে টিকে আছে একটি সুদৃশ্য মসজিদ- এই তর্কে ছেয়ে গেছে টক শো’র পর্দা। আর আমরা যারা গড় মানুষ, “দৈন্যের দায়ে বেঁচিব সে মায়ে”-অবস্থা, তারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি টিভি পর্দায় আসা আপাদ- মস্তক কাপড়ে ঢাকা উলঙ্গ ধর্ম বিক্রেতাদের দিকে।
সংবিধানের মূলমন্ত্রঃ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও …। থাক, সেসব কথা।

421547_555609347805849_1575068000_nএতক্ষণ যে বকছিলাম, এই বকার মাঝেও কিন্তু মার্ক্স সাহেব ঘাপটি মেড়ে বসে ছিলেন।
প্রিয়তমা, তোমাকে আমি নগ্ন করতেও চাই, দেখতেও চাই না। তুমি কী ভাবছো, যারা নগ্ন করছে তারা অনেক সুখে আছে? না, তারাও সুখে নেই। সমাজের ছিন্ন মুকুল হয়ে কেউ সুখে থাকতে পারে না। এদেরও ঘর-বাড়ি ছিল। এদেরও বোন আছে, আমার মত তাদেরও প্রিয়তমা আছে। তাদের ছোট বোনকে কেউ প্রেমপত্র দিলে তারাও তেঁড়ে আসে। তাহলে বলতো ফারাকটা কোথায়?
একটি গাছের মূল নষ্ট হলে তুমি যতই সে গাছের মাথায় পানি দাও, বাঁচাতে পারবে না। চোখের সামনে কেউ নগ্ন হয়ে পড়ে থাকছে, আর আমরা আমাদের গ্র্যান্ড ফিনালে মালয়েশিয়ায় করব নাকি আবুধাবিতে করব তাই নিয়ে মত্ত। শিক্ষা বলো, অ-শিক্ষা বলো, আমরা কার কাছ থেকে পাচ্ছি। আমরা ছুটে যাচ্ছি কিছু ভাড়াটে প্রতিষ্ঠানে। যেখানে তাবেদারি করছে ভাড়াটে পণ্ডিতবর্গ। তাদের মাঝেও আবার শতেক ভেদ। ব্যক্তিগত মন-মর্জির উপর ভর করে নুয়ে পড়ছে হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এখনো পাবলিক বাসে লেগে আছে রক্তের দাগ। হয়ত আর কখনো নতুন চামড়া গজাবে না মেয়েটির পুড়ে যাওয়া মুখে, ঘারে, পিঠে। এক সময় প্রতিরাতে যার ঢলো ঢলো মুখটা মনে করে ঘুমাতে যেত যে তরুণ প্রেমিক, সে আজ দিশেহারা। বাবার আদরের মেয়েটাকে নগ্ন করা হয়েছে ক্যামেরার সামনে।
প্রিয়তমা, তোমাকে যেমন ভালবাসি, এই দেশটাকেও ভালবাসি। তোমাদের দুজনকে আলাদা করে কখনো ভাবতে চাই না। কবিতাটি তাই তোমাদের দুজনকেই দিলামঃ

কত রক্ত গেছে জীবন গেছে
কত সম্ভ্রম
তবুও কেন হয়নি আমাদের
স্বাধীনতা অর্জন?

আস্তিক- নাস্তিক
আরো কত ভেদে
কেটেছে তোমাকে ওরা
হাজার টুকরো করে।

বারুদ আর বিস্ফোরণে
ঘৃণায় আর গ্লানিতে
তোমার নাম আজ
ধূলোয় মিশে গেছে।

এ কেমন স্বদেশ আমার
এ কেমন চ্ছিড়ি
সব কিছুর পরেও আমি
তোমায় ভালবাসি।
__________

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s